চট্টগ্রামবাসী শত বছরেও একজন মহিউদ্দিন পাবে না-পীর হাবিবুর রহমান।
চট্টগ্রামবাসী শত বছরেও একজন মহিউদ্দিন পাবে না
কিন্তু একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ববান ও দৃঢ়চেতা সাহসী রাজনীতিবিদ হিসেবে সেই বেদনা আড়াল করে পথ চলতে জানতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তার ব্যক্তিত্ব ও উঁচু মাথাকে নত না করে চট্টগ্রামের মানুষ ও রাজনীতির স্বার্থে অটল থেকে গেছেন। মনে পড়ে, সেই ’৯১ সালে যখন প্রথম দলীয় কার্যালয়ে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছিলাম। নোটবুকের কলম থামিয়ে অবাক হয়ে তাকাচ্ছিলাম। পাশে বসা একসময়ের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তিতুল্য ছাত্রনেতা খোরশেদ আলম সুজন আমার চেহারা দেখে হাসছিলেন।
আমি তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের ভাষা, বক্তব্য ও বাচনভঙ্গি দেখে চমকে উঠছিলাম। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। সেই থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মী হিসেবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন অবিচল। তার রাজনৈতিক জীবন কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদী মহিউদ্দিন চৌধুরী ভারতে ছিলেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অকুতোভয় এই সংগ্রামী নেতা ছিলেন অসাধারণ সংগঠক। কর্মীবান্ধব, গণমুখী ও রাজনৈতিক চরিত্র দিয়ে চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ই জয় করেননি; বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করেছেন।
তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে সরকারি বরাদ্দ ছাড়া কীভাবে একটি নগরী পরিচ্ছন্ন উন্নত নগরীতে পরিণত করা যায়, তিনি তা দেখিয়েছেন। ২০০৫ সালে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিএনপি শাসনামলে সরকারদলীয় প্রার্থী মীর নাছির উদ্দিনকে পরাজিত করেছিলেন। সেই ভোটযুদ্ধে তার নির্বাচনী সমন্বয়কারী আজকের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। চট্টগ্রাম যাওয়ার আগে তিনি ফোন করে বললেন, ‘তুমি চলে আসো।’ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও রসিকতার সঙ্গে টেলিফোনে বললেন, ‘তুমি কাভার করতে এলে ভোটযুদ্ধে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।’ আমার তখনকার অফিস থেকে অগ্রজ সহকর্মী শাহজাহান সরদার ও সাইফুল আলম অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে আমাকে পাঠালেন। সঙ্গে অকালপ্রয়াত পরিশ্রমী রিপোর্টার হোসাইন জাকির, শাহেদ সিদ্দিকী, ফটোসাংবাদিক শামিমুল হক।
ভোররাতেই চট্টগ্রাম নেমে রিকশাচালককে জিজ্ঞাসা করলাম, কে হবে আপনাদের মেয়র? রিকশার পেডেল ঘোরাতে ঘোরাতে তিনি নির্দ্বিধায় বললেন, হারিকেন। যেই হোটেলে উঠেছিলাম, সেটির মালিক বিএনপির সমর্থক। হোটেলবয় বললেন, এই হোটেলে বিএনপির নেতারা উঠেছেন। কিন্তু জিতবে হারিকেন। হারিকেন মানে মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতীক। পরদিন দোকানপাট, সিএনজিচালক, সাধারণ মানুষ যাকে জিজ্ঞাসা করি, সে-ই বলছিল, হারিকেন আর হারিকেন। পথে পথে বিএনপি প্রার্থী মীর নাছিরের ডিজিটাল ব্যানার, পোস্টার আর একের পর এক নির্বাচনী অফিস।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর নির্বাচনী কার্যালয় একটি। সেখানে বসেন ওবায়দুল কাদের। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের টিম করে পাঠান বিভিন্ন দিকে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর হালি শহরের বাসভবনে গিয়ে দেখলাম, অতি সাধারণ বাড়ি। পুরনো আসবাবপত্র। একটি দোতলা ছোট্ট পাকাঘর তিনি তৈরি করছেন। কিন্তু মহিউদ্দিন চৌধুরী পুরনো ঘরেই ঘুমান। বাইরে রান্নাবান্না হচ্ছে। তার বাসভবনে তিনি থাকুন আর না থাকুন নিয়মিত রান্নাবান্না হয় বছরের পর বছর। বাড়িতে যিনিই আসবেন, যেখান থেকেই আসেন না কেন; তাকে খাওয়া-দাওয়া করেই যেতে হয়। তার ইন্টারভিউ নিতে গেলাম দুপুরবেলায়। তিনি বললেন, ‘পীর সাহেব! আগে খেয়ে নেন।’ তার ছোট্ট বেডরুমের মেঝেতে দস্তরখানা বিছিয়ে খাবার আয়োজন। সেই নির্বাচন কাভারকালীন কয়েক দিন তার সঙ্গে খেতে হয়েছে।
সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান। বাইপাস হওয়ার পরও তাকে দেখলাম নিয়মিত ‘আগনী’ খেতে। ঢাকায় যেটি তেহারি, চট্টগ্রামে সেটি আগনী। সিলেটে বলে আখনী। সেই নির্বাচনের আগের দিন প্রচারণা বন্ধ, থমথমে পরিস্থিতি। নেতারা সলাপরামর্শ করছেন। মহিউদ্দিন চৌধুরী একটি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে কখনো বাটন টিপছেন। সন্ধ্যার পর তার বাসভবনে শত শত তরুণ। ফটোসাংবাদিক শামীমকে পাঠালে ফিরে এসে বললেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী ১০০ টাকা দিয়ে বলেছেন, এটা তবারক।
চট্টগ্রামের ডিসি গিয়েছিলেন। তাকেও দিয়েছেন। সবাইকে ১০০ টাকা করে তবারক দিলেন তিনি। নেতারা আশঙ্কা করছিলেন, গণরায় ছিনতাই হবে। মহিউদ্দিন চৌধুরী তার মতো সব ওয়ার্ডের কর্মীদের ডেকে বলে দিলেন, ফজরের নামাজ পড়ে ভোটারদের কেন্দ্রে কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে যেতে। নিজের ভোট দিয়ে বাকি সবাইকে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসতে। আমরা সংবাদকর্মীরা ঘুরতে ঘুরতে ভোট কেন্দ্রে দেখলাম হাওয়া মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুকূলে বইছে। যদিও আমি প্রথম দিনেই রিপোর্ট করেছিলাম, ‘গণরায় নেওয়া হয়ে গেছে তার’, ‘মহিউদ্দিনের পক্ষে গণজোয়ার’। নির্বাচনের শেষে হাজার হাজার নেতা-কর্মী নিয়ে কন্ট্রোল রুমের সামনে বসে থাকেন। কর্মীরা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে এলে হারিকেন হারিকেন স্লোগান তোলেন।
ফল নিয়ে ঘরে ফেরেন। ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র হানিফ চেয়েছিলেন ‘মেট্রোপলিটন’ নামে আর মহিউদ্দিন চৌধুরী ‘সিটি গভর্নমেন্ট’। মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম থেকে গণতন্ত্রের আগুনের বারুদ জ্বলে উঠেছে বার বার। তার জীবনের সব অর্জন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া। চট্টগ্রামবাসীর স্বার্থ রক্ষায় তিনি কোনো কিছুই তোয়াক্কা করতেন না। আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা হৃদয় দিয়ে কার্যত তিনি হয়ে উঠেছিলেন চট্টগ্রামের জননন্দিত নায়ক। একজন আল্লাহভীরু ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। হাজার হাজার মানুষকে হজ কাফেলায় নিয়ে গেছেন। তাদের সেবা-শুশ্রূষা করেছেন।
চিন্তা-ভাবনা-চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। চট্টগ্রামের ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সব মানুষকে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিতেন। চট্টগ্রামবাসী শত বছরে এমন নেতা গণমুখী সাহসী রাজনীতিবিদ পাবে কিনা সন্দেহ। নগর ভবনেও তিনি যখন বসতেন, শ দুয়েক মানুষের দুপুরের খাবার যেত বাড়ি থেকে। মানুষ নিয়ে চলতেন, মানুষ নিয়ে খেতেন। মানুষ নিয়ে ভাবতেন। তার মধ্যে কেউ কেউ লালুপ্রসাদ যাদবের ছায়া, কেউ কেউ মাহাথিরের মতো স্বাপ্নিক গুণাবলি দেখতেন। ডিসেম্বর এলেই তার নেতৃত্বে প্রতি বছর বিজয় মেলা হতো। প্রতি বছর বিজয়মঞ্চে অতিথি করে নিতেন আমাকে।
আওয়ামী লীগের যারা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অঙ্গীকার লালন করতেন না, আমার বক্তৃতায় তাদের সমালোচনা করেছি। আমার বক্তৃতার পর মহিউদ্দিন চৌধুরী এ নিয়ে ব্যাখ্যা দিতেন, ‘পীর হাবিবুর রহমান আওয়ামী লীগ করেন না। এ মঞ্চ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবার জন্য উন্মুক্ত। সবার কথা বলার স্বাধীনতা আছে। তার বক্তব্যে কেউ দুঃখ পাবেন না।’ চট্টগ্রামের মানুষ অতিথিপরায়ণ।
যতবার চট্টগ্রাম গিয়েছি, মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে একবেলা খেতে হয়েছে। সাবেক দুই মেয়র মীর নাছির ও মাহমুদুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতেও আতিথেয়তা নিতে হয়েছে। নিতে হয় সাবেক চাকসু ভিপি আমাদের অগ্রজ বন্ধু নাজিম উদ্দিনের আতিথেয়তাও। মহিউদ্দিন চৌধুরী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুগত ছিলেন।
ওয়ান-ইলেভেনে কারা নির্যাতনকালে তার কন্যাকে ক্যান্সারে হারিয়েছেন। তবু তার নেত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। কিন্তু তার প্রখর ব্যক্তিত্ব নিয়ে মত ও পথের অমিল থাকলেও সবার সঙ্গেই সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করতে কার্পণ্য করেননি। তার এই মৃত্যুতে রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। বিজয়ের মাসেই বীরযোদ্ধা মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিদায় গৌরব ও সম্মানের।



No comments